করোনাভাইরাস বৃত্তান্ত




আব্দুল বাসিত: গত বছরের শেষে চীনের উহান শহরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং দ্রুতই বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে পড়ে! বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই এখন আন্তর্জাতিকভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন! করোনাভাইরাস বৃত্তান্ত
 
ছবি: আব্দুল বাসিত
 
 
আজ ১০ এপ্রিল, ২০২০ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী ১৬ লক্ষ ৫০ হাজার ২১০ জন, এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৩ লক্ষ ৬৮ হাজার ৬৬৯ জন, মৃত্যু বরণ করেছেন- ১ লক্ষ  ৩৭৬ জন।
প্রতি মুহুর্তে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং কোথায় গিয়ে ঠেকবে আল্লাহ মালুম! 
 
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী এ রোগে মৃত্যুর হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটিকে চূড়ান্ত পরিসংখ্যান বলে ধরে নেয়া যাবেনা। কারন প্রকৃতপক্ষে এ রোগে আক্রান্ত সবাইকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে এটা সহজেই বলা যায়, ‘ফ্লু’ এর তুলনায় এ রোগের আক্রান্তের হার অনেক বেশী। এবং এর ভয়াবহতাও বেশী।
সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে রোগীর ফুসফুসের আবরণী কোষ ব্যাপক অংশজুড়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শেষ হতে আবরণী কোষের বাইরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নষ্ট হয়ে যায়।
ফলে ফুসফুসের মধ্যকার শ্বাসযন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার অনুপ্রবেশ ঘটে। ফলে তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। যার জন্য কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করতে হয়। 
 
এদিকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হতে থাকে। অন্যদিকে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত গতিতে বংশ বিস্তার করতে থাকে।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও ক্লান্ত এবং দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ে। ফলে ব্যাকটেরিয়া রক্তের মধ্যে প্রবেশ করে। এ অবস্থায় রোগী মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ে।

করোনাভাইরাস বৃত্তান্ত

 বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই একে মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে! তবে একে মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে, এ ভাইরাসের ভয়াবহতা বেড়েছে।
মুলতঃ এর দ্রুত ও ভৌগোলিক বিস্তারের স্বীকৃতিস্বরূপ একে মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
করোনাভাইরাস নির্দিষ্ট কোন ভাইরাস নয়, এটি একটি ভাইরাস পরিবার, যাতে অসংখ্য ভাইরাস রয়েছে!
তবে এ পরিবারের ছয়টি ভাইরাসই মানুষকে সংক্রমণ করতে পারতো, নতুন ভাইরাস নিয়ে এ সংখ্যা দাড়ালো সাতে। 


 
 
৭ জানুয়ারি, ২০২০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের উহানে প্রাপ্ত SARS ও MERS পরিবারের সদস্য করোনা ভাইরাসের সপ্তম প্রজাতির নামকরন করে 2019 Novel Corona Virus (2019-nCoV) এরপর ১১ ফেব্রুআরি ২০২০ WHO করোনাভাইরাস এর সংক্রমনে ফ্লু এর মতো উপসর্গ নিয়ে যে রোগ হয়, তার নামকরন করে COVID-19 বা Corona Virus Disease 2019।
করোনাভাইরাস বৃত্তান্ত
 
International Committee on Taxonomy of Viruses করোনাভাইরাস এর নতুন এ প্রজাতিকে SARS-CoV-2 নামে নথিভুক্ত করে।
 
চীনেই ২০০২ সালে আরেকটি করোনাভাইরাস ছড়িয়েছিল, যার নাম “সিভিয়ার একিউট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম” বা সার্স করোনা ভাইরাস। এতে ৮,০৯৮ জন আক্রান্ত হয় এবং ৭৭৪ জন মারা যায়।
২০১২ সালে সৌদি আরবে আরেকটি করোনাভাইরাস ছড়ায়, যার নাম ছিল “মিডল ইস্ট রেস্পিরেটরি সিনড্রোম” বা মার্স করোনাভাইরাস। এতে প্রায় ২৫০০ লোক আক্রান্ত হয় এবং ৮২৪ জনের মৃত্যু হয়।
এরা প্রত্যেকেই ফুসফুসজনিত রোগের লক্ষণ প্রকাশ করে।
 
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগের লক্ষণঃ-
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগ শুরু হয় জ্বর দিয়ে, এরপর শুরু হয় শুকনো কাশি, সাথে গলা ব্যথা, মাথা থাকে।
এক সপ্তাহ পর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তখন অনেক রোগীর ই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। প্রতি ৪জন আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে ১ জনের রোগেরতীব্রতা বেশী হয়! 
করোনাভাইরাস বৃত্তান্ত
 
কীভাবে ছড়ায়:-
করোনা ভাইরাস সংক্রমিত প্রাণীর সাথে মানুষের সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায়। এরপর মানুষ থেকে মানুষে বিভিন্ন উপায়ে এটি ছড়িয়ে পড়ে। একে বলা হয় তৃতীয় প্রজন্ম সংক্রমণ। তাছাড়া এ ভাইরাস বিবর্তিত হচ্ছে, যার কারনে আরো দ্রুত ও সহজে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।
মানুষ থেকে মানুষে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে- হাচি- কাশির মাধ্যমে বাতাস থেকে, আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ট মেলামেশা বা শারিরিক স্পর্শে বা আক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শ করেছে এমন যে কোন বস্তুর স্পর্শে। যাকে সামাজিক সংক্রমন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং এটিই এর সংক্রমনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সামাজিক পর্যায়ে কমপক্ষে ৪০৬ জন ব্যক্তির মধ্যে এ রোগ ছড়াতে পারে।
এখন এদের প্রত্যেকে আরো ৪০৬ জন করে ছড়ালে হিসাব গিয়ে কোথায় ঠেকে ভাবার বিষয়! 
 
চিকিৎসা:-
করোনা ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। বেশীরভাগ রোগী এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবেন। তাই এর চিকিৎসা মুলতঃ বিশ্রাম নেয়া আর জ্বর ও ব্যাথার ঔষধ খাওয়া।
এছাড়া কাশির জন্য গরম পানি দিয়ে গোসল করা যেতে পারে। একই সাথে প্রচুর পরিমানে তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে। বেশী অসুস্থতা অনুভূত হলে অবশ্যই হাসপাতালে যেতে হবে।

করোনাভাইরাস বৃত্তান্ত

 
প্রতিরোধ:-
করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য এখন পর্যন্ত কোন ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কার হয়নি।
তাই এভাইরাস প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হলো সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তির মধ্যে ভাইরাস ছড়ানো প্রতিরোধ করা। অর্থাৎ, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা।
একে বলা যায় সামাজিক ভ্যাকসিন। এর মানে হচ্ছে দুটি- প্রথমতঃ নিজে সংক্রমিত না হওয়া, দ্বিতীয়তঃ অন্যকে সংক্রমিত না করা। এর জন্য কিছু সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।
সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল এন্ড ডিপ্রেশন বা সিডিসি এর তথ্যানুযায়ী সুস্থ ব্যক্তিদের সাবান এবং পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে হবে।
হাত না ধুয়ে নিজের মুখ, চোঁখ কিংবা নাকে স্পর্শ করা যাবেনা। যারা এ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত তাদের থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। 
নিজে অসুস্থ অনুভূত হলে বাড়িতে অবস্থান করতে হবে। অন্যদের সাথে ঘনিষ্ট সংস্পর্শে যাওয়া যাবেনা। হাচি-কাশি আসলে টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হবে। তারপর টিস্যুটি ডাস্টবিনে ফেরে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।
ঘরের বাহিরে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ডিম এবং মাংস রান্নার সময় ভালভাবে সিদ্ধ করতে হবে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পরিষ্কার ও জীবানুমুক্ত রাখতে হবে।
সর্বোপরি সদা-সর্বদা পাক-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে এবং তাউবা ইস্তেগফার করতে হবে।
এ ধরনের ভাইরাসের সংক্রমন প্রতিরোধে জন-সচেতনার বিকল্প নেই।
আল্লাহ আমাদের এমন সব মহামারি ও সংক্রামক ব্যধি থেকে হেফাজতে রাখুন।
 
লেখক: পোস্ট মাস্টার, জালালাবাদ ক্যান্ট. সাব-পোস্ট অফিস,  সিলেট।
ইমেইল: abasit457@gmail.com